এআই-ভিত্তিক কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, নতুন অংশীদারত্ব ও প্রযুক্তি খাতের আশাবাদী পূর্বাভাসের কারণে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে সম্প্রতি। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর গত ১০০ দিনে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে প্রায় ৪ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্য যুক্ত হয়েছে। এতে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারগুলোর মোট বাজারমূল্য বেড়ে রেকর্ড ১৬১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। খবর আনাদোলু।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা স্বল্পমেয়াদি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাজারে কিছুটা প্রভাব ফেললেও তা প্রযুক্তি খাতের উত্থানকে থামাতে পারেনি।
বিশ্ববাজারে এ আশাবাদের বড় উৎস ছিল প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আয়-ব্যয়ের ফল। বিশেষ করে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার শক্তিশালী আর্থিক প্রতিবেদনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ২০২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল) আয় দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৮৫ শতাংশ বেশি। এ ফলাফল এআই খাতের সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। উল্লেখ্য, এনভিডিয়ার অর্থবছর শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে। সে হিসাবে কোম্পানিটির প্রথম প্রান্তিক ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল ধরা হয়।
এনভিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াং জানান, এআই কারখানা নির্মাণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো সম্প্রসারণের একটি। তিনি আরো জানান, এনভিডিয়ার ব্ল্যাকওয়েল ও রুবিন চিপ ২০২৭ সালের মধ্যে অন্তত ১ ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ মন্তব্যের পর প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোয় আরো ক্রয়চাপ দেখা যায়।
তবে এ উত্থানের বিপরীতে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অনিশ্চিত। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে গত ৯ মার্চ ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলারে পৌঁছে যায়।
পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ৮ এপ্রিল অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনা এগোতে থাকায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হয়ে এবং তেলের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। ফলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম পরে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে নেমে আসে। তবে যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় জ্বালানির দাম এখনো অনেক বেশি রয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও মূল্যস্ফীতির চাপের কারণে বিশ্বের বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নীতিনির্ধারণে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লড়াই আরো দীর্ঘ হতে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার কমানোর প্রত্যাশা কমে গেছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে, এমন আশঙ্কায় ফেডসহ কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেয়। আগে যেখানে বাজারে সুদহার কমার প্রত্যাশা ছিল, সেখানে এখন কঠোর মুদ্রানীতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের ১০০ দিনে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থানে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক। এ সময় সূচকটি ২২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা ছিল। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৭ দশমিক ৩ ও ডাও জোন্স সূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এছাড়া এশিয়ার আরেক গুরুত্বপূর্ণ বাজার জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। ইতালির এফটিএসই এমআইবি সূচকও ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপের কয়েকটি বড় বাজারে পতন দেখা গেছে। জার্মানির ডিএএক্স ৪০ সূচক ২ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক কমেছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। স্পেনের আইবেক্স ৩৫ সূচক দশমিক ৮ ও যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক ৪ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।
এশিয়ায়ও সব বাজার একই পথে হাঁটেনি। চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচক ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক কমেছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
শুধু শেয়ারবাজার নয়, সরকারি বন্ডবাজারেও চাপ দেখা গেছে। যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসায় উত্তেজনা আবারো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে অনেক দেশে সরকারি বন্ড বিক্রির প্রবণতা বাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১৯ মে ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। এটি ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়।
ইউরোপেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে। জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ৩ দশমিক ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ। ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ, যা ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ। যুক্তরাজ্যের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ৫ দশমিক ১৯ শতাংশে উঠে গেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ।
জাপানেও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। ফলে বাজারের ধারণা, দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছর দুই দফা সুদহার বাড়াতে পারে। এ সময় জাপানের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার ২ দশমিক ৭৬ শতাংশে পৌঁছায়, যা ১৯৯৭ সালের পর সর্বোচ্চ।
তবে চীনের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার ১ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটি প্রায় ৭ বেসিস পয়েন্ট কমেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির বদলে মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি থাকায় চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করবে না।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখনো প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের দিকে। সে কারণেই যুদ্ধকালীন ঝুঁকির মধ্যেও বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে।